নিজস্ব প্রতিবেদক
সরকারি চাকরিতে কোটা বৈষম্য নিরসনে লাগাতার আন্দোলনের অংশ হিসাবে বাংলা ব্লকেড বা বাংলা অবরোধ কর্মসূচি ঘোষনা করেছে সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্ল্যাটফরম ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’। এবার সরকারি চাকরির সব গ্রেডে সব মিলিয়ে ৫ শতাংশ কোটা রাখার দাবি জানিয়ে ১০ জুলাই সারা দেশে সকাল-সন্ধ্যা ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচি ঘোষণা করেন। দেশের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও রেলপথ এ অবরোধ কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
২০২৪ সালের ৯ জুলাই মঙ্গলবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে এক সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দেন আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম। ওই ঘোষনার পর আন্দোলনের নতুন রূপ ধারন করে। সারাদেশে আন্দোলন বেগবান হয়। আন্দোলন ঠেকাতে ছাত্রলীগ ও পুলিশ মরিয়া হয়ে ওঠে। আন্দোলনে জড়িত ছাত্রদের ধরপাকড় শুরু করে পুলিশ ও ছাত্রলীগ নেতারা।
এদিনও কোটা বাতিলের দাবিতে বরিশাল, হবিগঞ্জ, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, রাঙামাটি, ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে অবরোধ, বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন করেন শিক্ষার্থীরা। সবগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাথীরাও আন্দোলনে যাপিয়ে পড়ে।
সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, বুধবার সকাল-সন্ধ্যা ব্লকেড (অবরোধ) কর্মসূচি পালিত হবে। গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও রেলপথ এর আওতাভুক্ত থাকবে। দেশের বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রতিষ্ঠানের কাছের সড়ক অবরোধের আহ্বান জানান তিনি। নাহিদ ইসলাম বলেন, এ আন্দোলন শিক্ষার্থীরা তৈরি করেনি। হাইকোর্টের রায় ও সরকারের নিশ্চুপ ভূমিকার প্রেক্ষাপটে এ আন্দোলন। আমাদের আন্দোলনের ফলে জনগণের যে ভোগান্তি হচ্ছে, এর দায় সরকারকে নিতে হবে। কারণ, আমরা এতদিন ধরে আন্দোলন করছি-কিন্তু এখনো সরকার বা নির্বাহী বিভাগ থেকে কোনো আলোচনার ডাক বা আশ্বাস পাইনি। আমরা এমন একটা চূড়ান্ত সমাধান চাচ্ছি যাতে ভবিষ্যতে কোটা নিয়ে কোনো ধরনের জটিলতা তৈরি না হয়। সেজন্য আমরা অনগ্রসর জাতির কথা বিবেচনায় রেখে সংসদে আইন পাশ করার মাধ্যমে কোটার যৌক্তিক সংস্কার দাবি করছি। সমন্বয়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, আমরা যে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছি, এটা কোটা বাতিলের নয়, বরং বাস্তবতার সঙ্গে সমন্বয় করে যৌক্তিক সংস্কার। বিভিন্ন গণমাধ্যমে আমাদের দাবিকে বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। এ আন্দোলন মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী নয়। মুক্তিযোদ্ধাদের রিওয়ার্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলিনি। আমরা মুক্তিযোদ্ধাদের নাতিপুতি, পোষ্য কোটার বিরোধিতা করছি। আমাদের আন্দোলন গণ-আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। কৃষক, শ্রমিক, প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধা সবাই এতে সমর্থন জানিয়েছেন। আমরা নীতিনির্ধারক, বিশেষজ্ঞ, আইনজীবী, গণমাধ্যম- সবার সঙ্গে সমন্বয় করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি।
২০২৪ সালের ৯ জুলাই অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন রাজশাহী কলেজের শিক্ষার্থীরা। এ সময় তারা কলেজের সামনের সড়ক অবরোধ করেন। দুপুর ১২টার দিকে কলেজ গেটের সামনে অবস্থান নেন শিক্ষার্থীরা। এরপর সড়কে বসে পড়েন তারা। প্রায় আধাঘণ্টা সড়কটি অবরোধ করে রাখেন আন্দোলনকারীরা। আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থী সামিউল ইসলাম বলেন, একজন মেধাবী শিক্ষার্থী সারা বছর পড়াশোনা করে চাকরির বাজারে কোটার কাছে হেরে যাচ্ছেন। ভালো চাকরি পাচ্ছেন না। অথচ একজন অযোগ্য লোক কোটা থাকায় চাকরির বাজারে টিকে যাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যারিস রোডে এ অবস্থান কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। ‘কোটাপদ্ধতি সংস্কার আন্দোলন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়’-এর ব্যানারে এ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। বিক্ষোভ মিছিল, সংক্ষিপ্ত সমাবেশ ও ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার থেকে মিছিলটি শুরু হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক সংলগ্ন ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে গিয়ে শেষ হয়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে গণসংযোগ করেন শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের শহিদ মিনারে অবস্থান কর্মসূচি ও পাঁচটি ছাত্রী আবাসিক হলে গণসংযোগ চালান তারা। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা বলেন, ছাত্রীদের হলের গেটের সামনে গিয়ে আন্দোলন সম্পর্কে তাদের বলেছি, তারা আগ্রহ দেখিয়েছেন।
ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের নথুলাবাদ বাস টার্মিনালের সামনে অবরোধ করেন বিএম কলেজ শিক্ষার্থীরা। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় (ববি) গেটের সামনে অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা। মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে প্রতিবাদী গান-কবিতা আবৃত্তি করেন তারা। সন্ধ্যার পর মহাসড়কে মশাল মিছিলের মধ্য দিয়ে কর্মসূচি শেষ করা হয়।
হবিগঞ্জে বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন করেন শিক্ষার্থীরা। শহরে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে এ বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। মিছিলটি শহর প্রদক্ষিণ শেষে বৃন্দাবন সরকারি কলেজে গিয়ে শেষ হয়।
রাঙ্গামাটি, বান্দরবান শহরেও ছাত্রছাত্রীরা বিক্ষোভ মিছিল করে। এছাড়া চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে।
