নিজস্ব প্রতিবেদক
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন আর কেবল কোটা সংস্কারের ইস্যুতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। আন্দোলনের সময় ছাত্র জনতা হত্যা, গুম, খুন, গ্রেফতারের প্রতিবাদ ও গ্রেফতারকৃতদের মুক্তির দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত রাখার কথা জানান আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, প্রজ্ঞাপন জারির সাথেই এই আন্দোলনের সমাপ্তি ঘটবে না। ছাত্র-নাগরিক হত্যা ও গুম-খুনের বিচার, রাষ্ট্রীয় ক্ষয়ক্ষতির বিচার, মামলা প্রত্যাহার ও ডাকসু সমাজসেবা সম্পাদক আখতার হোসেনসহ নিরপরাধ ব্যক্তিদের মুক্তি, আহত-নিহতদের ক্ষতিপূরণ এবং সকল ক্যাম্পাসে সন্ত্রাসী রাজনীতির উৎখাত ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিচারের দাবিতে দফাভিত্তিক আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।
এ লক্ষ্যে তারা আন্দোলন চারিয়ে যেতে ছাত্রদের সংঘঠিত করতে থাকে। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারনা চালাতে থাকে।
এদিকে কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সহিংসতার ঘটনায় সারা দেশে গণগ্রেফতার চলে। গত ৯ দিনে (১৭ থেকে ২৫ জুলাই) সারা দেশে কমপক্ষে ৫ হাজার জনকে গ্রেফতার করা হয়। এর মধ্যে রাজধানীতে ২ হাজার ২০৯ জন, চট্টগ্রামে ৭৩৫ জন, বরিশালে ১০২ জন, নরসিংদীতে ১৫৩ জন ও সিলেটে ১২৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়।
রাজধানী ঢাকায় সরকারি স্থাপনায় ভাঙচুর, সহিংসতা ও নাশকতার ঘটনায় মহানগরের বিভিন্ন থানায় ২০১টি মামলা দায়ের করা হয়। এসব মামলায় ২৫ জুলাই পর্যন্ত ২ হাজার ২০৯ জনকে গ্রেফতার করা হয়।
কারফিউ শিথিল করা হলে জনজীবন ছিল স্থবির। ২৬ জুলাই থেকে সীমিত পরিসরে আন্তঃনগর ট্রেন চালানোর পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু জননিরাপত্তার কথা উল্লেখ করে বাংলাদেশ রেলওয়ে ট্রেন চালানোর সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে।
বৃহস্পতিবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে শিক্ষার্থীরা জানান, গত ২৩ জুলাই প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে আংশিক বিজয় অর্জিত হয়েছে বলে মনে করে ‘সাধারণ শিক্ষার্থী মঞ্চ’। বিবৃতিতে ৯১ জন শিক্ষার্থী স্বাক্ষর করেন।
এছাড়াও ২৫ জুলাই বৃহস্পতিবার চিকিৎসাধীন আরও তিনজনের মৃত্যু হয়। সব মিলিয়ে মৃত্যু বেড়ে দাঁড়ায় ২০৩ জনে উন ্নীত হয়। এইদিন অ্যামনেস্টি প্রতিবেদন দিয়ে বলেছে, প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করেছে পুলিশ।
২৫ জুলাই পর্যন্ত ঢামেক মর্গ কর্তৃপক্ষ মৃতদের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করে স্বজনদের কাছে ৮৫টি লাশ হস্তান্তরর করে। আর বাকি আটজনের লাশের পরিচয় না থাকায় ময়নাতদন্ত করে দাফনের জন্য স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামে দেওয়া হয়।
চলমান পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় কারফিউ শিথিলের সময়সীমা দুই ঘণ্টা বাড়িয়ে সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৫টা করা হয়। একই সঙ্গে শুক্র ও শনিবার ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, গাজীপুরে কারফিউ অব্যাহত থাকবে বলে গণমাধ্যমকে জানান তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান। কারণ ওইসব এলাকায় আন্দোলন চলছিল।
এদিকে কারফিউর ষষ্ঠ দিনেও বৃহস্পতিবার রাজধানীতে ছিল কঠোর সেনা টহল। তবে যে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সতর্কাবস্থায় রাখা হয় । এইদিন বিভিন্ন মোড়ে চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি চালানো হয়। এর পাশাপাশি চলেছে নিয়মিত টহল।
এদিকে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার টুর্ক বাংলাদেশে দমন-পীড়নের নিন্দা জানান। তিনি বাংলাদেশ সরকারের কাছে জরুরিভাবে গত সপ্তাহের বিক্ষোভ দমন, ভয়াবহ সহিংসতা সম্পর্কে বিশদ বিবরণ প্রকাশ এবং সব আইন প্রয়োগকারী কার্যক্রম যেন আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের নিয়ম ও মানদণ্ড মেনে চলে তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
কোটা সংস্কারের দাবিতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে ঘিরে দেশব্যাপী সৃষ্ট উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি, ইন্টারনেট বন্ধ, কারফিউ জারি, স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়াসহ নানা কারণে উদ্বিগ্ন প্রবাসী এবং বাংলাদেশি বংশোদ্ভূতরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যে বিক্ষোভ করেন তাদের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য চায় সরকার। বিশ্বের নানা দেশে থাকা বাংলাদেশ দূতাবাস, হাইকমিশন এবং অনাবাসিক মিশনগুলোর মাধ্যমে হোস্ট গভর্মেন্টের কাছে তথ্য চেয়ে চিঠি পাঠায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সারাদেশে অচলাবস্থার কারণে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা বিবেচনায় চলমান এইচএসসির আগামী সপ্তাহের ২৮, ২৯, ৩১ জুলাই ও ১ আগস্টের পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। এর আগে, কোটা সংস্কার নিয়ে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা বিবেচনায় প্রথমে ১৮ জুলাইয়ের, পরে ২১, ২৩ ও ২৫ জুলাইয়ের এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত করে আন্তঃশিক্ষাবোর্ড।
এদিকে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের ‘জরুরি নন’, এমন কর্মী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের স্বেচ্ছায় বাংলাদেশ ছেড়ে যাওয়ার বিষয়টি অনুমোদন দেয় যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র ম্যাথু মিলার।
বুধবার জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্রের কার্যালয়ের নিয়মিত প্রেস ব্রিফিংয়ে জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক বলেন, ‘বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সহিংসতার সব ঘটনার স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে তদন্ত করা উচিত।’
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল জানান, কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে বাংলাদেশে সৃষ্ট অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির ওপর দেশটি তীক্ষ্ণ নজর রেখেছে। ভারত আশা করে, বাংলাদেশে দ্রুতই শান্তি ফিরে আসবে।
২৫ জুলাই সারাদেশে ইন্টারনেট চালু, কারফিউ তুলে দেওয়াসহ ‘জরুরি’ চার দফা দাবিতে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম বৃহস্পতিবার শেষ হয়। তবে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করতে না পারায় নতুন কর্মসূচির ঘোষণা করতে পারেননি তারা।
এছাড়াও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নামে আরেক অংশের একটি বিবৃতি গণমাধ্যমে পাঠানো হয়। এর সমন্বয়ক হান্নান মাসুদের বরাত দিয়ে ওই বিবৃতিতে বলা হয়, শুক্রবার বাদ জুমা সারাদেশে বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে প্রার্থনা ও শোক মিছিল করা হবে।
এদিকে, ‘রাষ্ট্র ব্যবস্থা থেকে সকল অপরাধীকে অপসারণ’ শিরোনামে এক দফা দাবিতে শুক্রবার ‘শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি’ ঘোষণা করেন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এতে সারাদেশে মসজিদ-মন্দিরসহ সব ধর্মীয় উপাসনালয়ে প্রার্থনা এবং সব সাংবিধানিক নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠানের দৃষ্টি আকর্ষণে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ করার কথা বলা হয়।
অন্যদিকে বৃহস্পতিবার বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে আটটি বার্তা দেওয়া হয়। এর মধ্যে রয়েছে হতাহতদের তালিকা তৈরি, হত্যা ও হামলায় জড়িতদের চিহ্নিত করা, বিশ্ববিদ্যালয় ও হল খুলে দেওয়ার জন্য চাপ তৈরি, হাসপাতালে চিকিৎসাধীনদের সহযোগিতা, রংপুরের আবু সাঈদসহ নিহত সবার কবর জিয়ারত, রুহের মাগফেরাত কামনা ও পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানানো।
কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে হেলিকপ্টার থেকে কোনো গুলি চালানো হয়নি বলে জানায় র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)। এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, যারা রাস্তায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছিল তাদের ছত্রভঙ্গ করতে হেলিকপ্টার থেকে কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়া হয়েছে।
