নিজস্ব প্রতিবেদক
জনতা ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আবুল বারকাতকে দুদকের মামলায় কারাগারে পাঠানো হয়েছে। শুক্রবার বিকেলে শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানা এ আদেশ দেন। এদিন দুপুর ২ টা ২২ মিনিটের দিকে ড. বারাকাতকে সিএমএম আদালতের হাজতখানায় হাজির করা হয়। এরপর দুপুর ২ টা ৪৯ মিনিটের দিকে আদালতের এজলাসে তোলা হয় ড. বারকাতকে। দুদকের মামলায় তার বিরুদ্ধে অ্যাননটেক্স গ্র“পকে বেআইনীভাবে ঋণ দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। এছাড়া তার সময়ে জনতা ব্যাংকে অনেক অনিয়ম ও জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। তিনি সেগুলো প্রতিরোধ করেননি। উল্টো রাজনৈতিক চাপের কারণে নির্লিপ্ত থেকেছেন। তার নির্লিপ্তার কারণেই জনতা ব্যাংকে ধ্বংসের প্রক্রিয়া শুরু হয়। পরবর্তীতে যারা চেয়ারম্যান বা এমডি হিসাবে এসেছেন তারা রাজনৈতিক চাপে ব্যাংকটিকে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন।
বর্তমানে ব্যাংকটির বিতরণ করা মোট ঋণের মধ্যে খেলাপি ঋণ প্রায় ৭৫ শতাংশ। এর মধ্যে ৬৫ শতাংশই আদায় অযোগ্য ঋণে পরিণত হয়েছে। তারল্য সংকট প্রকট। লাভের পরিবর্তে এখন লোকসান হচ্ছে। অদক্ষ পর্ষদ ও দুর্নীতিবাজ ব্যবস্থাপনাকর্তৃপক্ষের কারণে সরকারি খাতের ব্যাংকটি আজ অতি দুর্বলতার তালিকায় চলে গেছে।
জনতা ব্যাংকের মাধ্যমে আলোচিত অ্যানন টেক্স গ্র“পকে দেওয়া ২৯৭ কোটি টাকার ঋণ কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে দুদকের মামলায় আবুল বারাকাতকে গ্রেফতার করা হয়। ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগপন্থী এই অর্থনীতিবিদ ক্ষমতাচ্যুত প্রধনমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্টজন হিসেবে বেশ পরিচিত ছিলেন। তিনি আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ম্যানিফেষ্টো তৈরিতেও অন্যতম প্রধান ভ’মিকা রেখেছেন।
সূত্র জানায়, প্রচলিত বিধি অনুযায়ী এনন টেক্স গ্রুপ জনতা ব্যাংক থেকে এক দফা ঋণ পেয়ে দ্বিতীয় দফায় আর ঋণ পাচ্ছিলেন না। কারণ তিনি ঋণ নিয়ে তা যথাযথভাবে ব্যবহার করেননি। ফলে পরবর্তীতে দেওয়ার বিধি বিধান অনুযায়ী তিনি ঋণ পাওয়ার যোগ্য ছিলেন না। তখন এননটেক্স গ্র“পের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ইউনুস (বাদল) জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. আবুল বারাকাতের সঙ্গে দেখা করে তাকে ঋণ দেওয়ার দাবি দাবি করেন। তিনি ভালবাবে ব্যবসা করে আগের ঋণসহ নতুন নেওয়া ঋণ পরিশোধের অঙ্গিকার করেন। এতে প্রভাবিত হয়ে আবুল বারাকাত তাকে ঋণ নিতে নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছিলেন। কিন্তু শর্ত দিয়েছিলেন ঋণের প্রস্তাব শাখা থেকে বিধিসম্মতভাবে আসতে হবে।
কিন্তু এননটেক্স গ্র“পের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ইউনুস (বাদল) ড. বারাকাতের কথায় আস্বস্ত না হয়ে তিনি যোগাযোগ করেন ব্যাংকের তৎকালীন সিবিএ নেতা ও ব্যাংকের কারনিক রফিকুল ইসলামের সঙ্গে। তিনিই বাদলকে নিয়ে ব্যাংকের এমডি ও চেয়ারম্যানের কাছে গিয়েছিলেন। কারণ সিবিএ নেতা ও শ্রমিক লীগের নেতা নেতা হিসাবে রফিকুল ইসলামের ছিল ব্যাংকে ব্যাপক দাপট। তিনি রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ব্যাংকে যে কোন বেআইনী কাজ করতে পারতেন। তিনি তা করেছেন। এসব করে তিনি সম্পদের পাহাড় গড়েছেন।
ইউনিূস বাদল আগে ছিলেন একজন পরিবহণ শ্রমিক নেতা। সূত্রে রফিকুল ইসলামের সঙ্গে আগেই পরিচয় ছিল। পরিবহণ শ্রমিক নেতা থেকে তিনি ব্যবসায় আসেন। সে ব্যবসায় প্রথমে বাল করছিলেন না। পওে রফিকুল ইসলামের হাত ধরে ব্যাংক থেকে মোটা অংকের ঋণ নেন। এনন টেক্স গ্রুপ এখন পর্যন্ত জনতা ব্যাংক থেকে ৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। সুদসহ ঋণের পরিমাণ বেড়ে বর্তমানে ১০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। পুরো ঋণটিই এখন খেলাপি। এর মধ্যে মাত্র ২৯৭ কোটি টাকা ঋণের জালিয়াতির দায়ে মামলা হলো। তবে জনতা ব্যাংক এনন টেক্সের বিরুদ্ধে ঋণ আদায়ের জন্য মামলা করেছে।
এনন টেক্সে এতো ঋণ নিতে সহায়তা করেছে ব্যাংকের সাবেক এমডি, ডিএমডি, জিএমসহ শাখা ব্যবস্থাপক। এসব খাতে প্রভাব রাখতের সিবিএ নেতা রফিকুল ইসলাম। ফলে নীচের দিক থেকে তার ঋণের প্রস্তাব পরিশুদ্ধভাবে পর্ষদে উপস্থাপন করা হতো। পর্ষদ তা কোন রকম যাচাই বাছাই না করেই অণুমোদন দিয়ে দিতো। অথচ পর্ষদের দায়িত্ব ছিল ঋণ অনুমোদনের আগে খুনিনাটি বিষয়গুলো যাচাই বাছাই করা। কিন্তু তা করা হয়নি। এ কারণে পর্ষদ এনন টেক্সেও ঋণের জালিয়াতির দায় এড়াতে পারে না। ব্যাংকের ডেক্স কর্মকর্তা থেকে শুরু করে শাখা ব্যবস্থাপক, জিএম, ডিএমডি, এমডি ও ক্রেডিট কমিটি এনন টেক্সের বিষয়ে যে বুল তথ্য দিয়ে পর্ষদে প্রতিবেদন উপস্থাপন করেছেন সে কারণে তারাও এই জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত।
ড. আবুল বারাকতা ক্লিন ইমেজের মানুষ হলেও ব্যাংকের চেয়ারম্যানের পদে এসে তিনি দায়িত্ব অবহেলায় জড়িয়ে যান। তিনি চেয়ারম্যান হিসাবে নিজের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেননি। যে কারণে ওই সময়ে রাজনৈতিক প্রভাবে অনেক জাল জালিয়াতি হয়েছে। কিন্তু তিনি রাজনৈতিক চাপকে মোকাবেলা করতে পারেননি। ওই সময়ে শুধু এনন টেক্স জালিয়াতি হয়েছে তা নয়। ক্রিসেন্ট গ্রুপের বড় জালিয়াতি হয়েছে। ওই গ্রুপের কাছেও ব্যাংকের ঋণ প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে বড় অংশই খেলাপি। এক্ষেত্রেও সিবিএ নেতা রফিকুল ইসলাম ভ’মিকা রেখেছেন। কারণ তার নিজের চলচিত্র ব্যবসার প্রতিষ্ঠান ঝিনুক কথাচিত্রের সঙ্গে মালিকানা রয়েছে। সে হিসাবে তিনি ক্রিসেন্ট গ্রুপের মালিকের ভাইয়ের প্রতিষ্ঠান জাজ কর্পোরেশনকে দেওয়া হয়েছে ক্রিসেন্ট গ্রুপের টাকা। ফলে দুই পক্ষই চলচিত্র ব্যবসায় টাকা বিনিয়োগ করে অন্যান্য বেআইনী কাজ করবার করেছেন। দুই গ্রুপের কাছ থেকেই রফিকুল ইসলাম মোটা াংকের টাকা নিয়েছেন। সে টাকায় তিনি টাঙ্গাইলে একটি বিশাল ও ব্যয়বহুল মসজিদ তৈরি করেছেন। মধুরিমা নামে একটি সিনেমা হলেও মালিক ছিলেন তিনি। সেটি এখন বন্ধ। গুলিস্তান খদ্দর মার্কেটেও তার কয়েকটি দোকান রয়েছে। তিনি এক সময় এই মার্কেটের মালিক সমিতির সভাপতিও ছিলেন। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে একজন ব্যাংকের কারনিক হিসাবে তিনি কিভাবে এসব সম্পদ অর্জন করেছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মূলত প্রভাব খাটিয়ে বেআইনী ঋণ পাইয়ে তার বিপরীতে কমিশন নিয়েই এসব সম্পদ অর্জন করেছেন।
জনতা ব্যাংকে ড. বারাকাতের সময়ে আরও অনেক অনিয়ম হয়েছে। সেগুলো তিনি প্রতিরোধ করেননি। এর মধ্যে ব্যাংক রাজনৈতিক বিবেচনায় অনেক খেলাপি ঋণ কিনেছে। কোন ডাউন পেমেন্ট ছাড়াই সেগুলো নবায়ন করে আবার নতুন ঋণ দিয়েছে। সেগুলোও এখন খেলাপি। এছাড়া বেক্সিমকো গ্রুপ জনতা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে রপ্তানি করে ডলার দেশে না এনে বিদেশে পাচার করেছেন। কেবল বেক্সিমকো গ্রুপই জনতা ব্যাংকের স্থানীয় কার্যালয় থেকে ২৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছেন। যেগুলোর মধ্যে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকাই খেলাপি। এস আলম গ্রুপের কাছে খেলাপি ঋণ ১০ হাজার কোটি টাকা।
এদিকে ওই সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ছিলেন ড. আতিউর রহমান। তার সঙ্গে আবুল বারাকাতের বেশ বিবাদ ছিল। যে কারণে আতিউর রহমান জনতা ব্যাংকের ওপর একাধিক পরিদর্শন করিয়েছিলেন। কিন্তু সেগুলেঅতে অনিয়মের তথ্য ওঠে আসলেও তৎকালীন গভর্নরও রাজনৈতিক চাপের কারণে কোন ব্যবস্থা নিতে পারেননি। উল্টো সব ধরনের বেআইনী ঋণকে একের পর এক কেন্দ্রীয় ব্যাংক অনুমোদন করে গেছে।
ড, আতিউরের পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গর্ভনেরর দায়িত্ব পান সাবেক অর্থ সচিব ফজলে কবির। তিনিও ব্যাংক খাতে সব ানিয়মের বিষয়ে নিরব দর্শকের ভ’মিকা পালন করেন। তিনি কোন অনিয়ম যাতে উদঘাটিত না হয় সেজন্য পরিদর্শন ব্যবসস্থাকে একেবাওে অকেজো করে রাখেন। ফলে তিনিও কোন ানিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেননি। এরপর আবদুর রউফ তালুকদার কেন্দ্রীয়ঢ ব্যাংকের গভর্নও পদে বসে আগে অনিয়মের বিরুদ্ধেও কোন ব্যবস্থা নেননি। উল্টো তিনি আরও জালিয়াতিকে উস্কে দেন।
