নিজস্ব প্রতিবেদক
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) পূর্বনির্ধারিত ‘মার্চ টু গোপালগঞ্জ’ কর্মসূচিতে হামলা চালিয়েছে আওয়ামী লীগ। বুধবার দুপুরের পর থেকেই তারা বিভিন্ন স্থানে বেরিকেড দিয়ে সমাবেশ স্থলে যাতে মানুষ না যেতে পারে সেজন্য বাধার সৃষ্টি করে। এনসিপির গাড়ির বহর গোপালগঞ্জে প্রবেশের সময় তারা বিচ্ছিন্নভাবে হামলা করে। এনসিপির প্রতিরোধের মুখে আওয়ামী লীগের লোকজন পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। দুপুরের পর সমাবেশ স্থল ঘিরে দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়। পরে তা রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নেয়। এ ঘটনায় অন্তত চারজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এছাড়া পুলিশ, সাংবাদিক, সাধারণ পথচারীসহ আহতের সংখ্যা কয়েকশ। ঘটনার পর জেলাজুড়ে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে বুধবার রাত ৮টা থেকে আজ ভোর ৬ পর্যন্ত কারফিউ জারি করে স্থানীয় প্রশাসন। এতে জনজীবন অচল হয়ে পড়েছে। গোপালগঞ্জ দিয়ে দূরপাল্লার যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে।
এদিকে হামলারকারীদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেফতারের আলটিমেটাম দিয়েছে এনসিপি। তারা প্রশাসন ভুল তথ্য দিয়েছে। প্রশাসন বলেছিল, গোপালগঞ্জে সমাবেশ করতে কোন সমস্যা নেই। হামলার কোন শংঙ্কা নেই।
দিনভর হামলা, সংঘর্ষ, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ এবং মুহুর্মুহু গুলির শব্দে পুরো শহর রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। হাতবোমা, সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ, ইটপাটকেল এবং উভয় পক্ষের পালটাপালটি ধাওয়ায় চারদিকে আতঙ্ক নেমে আসে। দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়। পথচারীদের যে যার মতো নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছোটাছুটি শুরু করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনীর পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক বিজিবি ও পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে গোপালগঞ্জে আজকের এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানানম সংঘর্ষ চলাকালে এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতারা রীতিমতো অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। নিরাপত্তাহীন পরিস্থিতিতে দলটির কেন্দ্রীয় নেতাদের কেউ কেউ পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে ঢুকে পড়েন। পরে সেনা প্রহরায় তাদের অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়। হামলায় নিহতরা হলেন-দীপ্ত সাহা, রমজান কাজী, সোহেল রানা মোল্লা ও ইমন তালুকদার। তবে তাৎক্ষণিকভাবে নিহতদের বিস্তারিত পরিচয় জানা যায়নি।
হামলার প্রতিবাদে সারা দেশে ‘বাংলা ব্লকেড’-এর হুঁশিয়ারি দিয়েছে এনসিপির যুব সংগঠন জাতীয় যুবশক্তি। এছাড়া আজ বৃহস্পতিবারের দলের মাদারীপুর ও শরীয়তপুরে পদযাত্রা কর্মসূচি স্থগিত করা হয়েছে।
হামলার ঘটনায় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভ মিছিল করেছে রাজনৈতিক দলের ছাত্রসংগঠনগুলো। বিভিন্ন রাজনৈতি দল ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে।
বুধবার সকাল থেকেই এনসিপি নেতাকর্মীদের গোপালগঞ্জে আগমন ঠেকাতে আওয়ামী লীগ ও যুবলীগ এবং ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা রাস্তায় মহড়া দিতে শুরু করে। সড়কের বিভিন্ন জায়গায় গাছ ফেলে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে । বেশ কয়েকটি জায়গায় গাড়ি ভাঙচুর ও আগুণ দেওয়া হয়। কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যদের ওপরও হামলা করা হয়। এতে বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য গুরুতর আহত হন।
বেলা ১১টার দিকে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) গাড়িতেও আগুন দেওয়া হয়। দেশীয় অস্ত্র এবং লঠিসোঁটা হাতে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা শহরের মোড়ে মোড়ে অবস্থান নেন। বেলা দেড়টার দিকে গোপালগঞ্জ পৌর পার্কে এনসিপির পথসভা শুরুর আগেও এক দফা মঞ্চ ভাঙচুরের চেষ্টা হয়। পরে এনসিপি ও পুলিশ একত্রে দুর্বৃত্তদের ধাওয়া দিলে তারা পিছু হটে। পরে নির্ধারিত সময়ে সভা শুরু হয়। এতে দলের নেতাকর্মী ও ছাত্র-জনতার উদ্দেশে এনসিপির আহ্বায়ক মো. নাহিদ ইসলাম বলেন, গোপালগঞ্জের মানুষকে আওয়ামী রাজনীতির দুষ্টচক্র থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এ সময় তিনি বাংলাদেশ থেকে মুজিববাদী রাজনীতির কবর রচনার ঘোষণা দেন। সদস্য সচিব আখতার হোসেন, মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) হাসনাত আবদুল্লাহ, মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলমসহ কেন্দ্রীয় নেতাদের কয়েকজন বক্তব্য দেন।
এনসিপি নেতাদের বক্তব্য শেষ হওয়ার পর বেলা বেলা আড়াইটার দিকে সেখানে হামলা চালায় আওয়ামী লীগ। এ সময় সাউন্ড বক্স, মাইক ও চেয়ার ভাঙচুর করা হয়। হামলাকারীরা এনসিপির ব্যানার ছিঁড়ে ফেলে। অগ্নিসংযোগ করে। এছাড়া এনসিপি নেতাদের গাড়িবহর লক্ষ্য করে বৃষ্টির মতো ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। এ সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এবং বেশ কয়েকটি গণমাধ্যমের গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। একপর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ও সেনাবাহিনী ফাঁকা গুলি, সাউন্ড গ্রেনেড এবং কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে। পরিস্থিতি সামাল দিতে জেলা প্রশাসন প্রথমে ১৪৪ ধারা জারি করে, পরে কারফিউ জারি করা হয়।
