নিজস্ব প্রতিদেক
বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান সোমবার দুপুর সোয়া একটায় রাজধানীর উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিধ্বস্ত হয়েছে। এতে বিমানের একটি অংশ শ্রেণিকক্ষের ভেতরে ঢুকে পড়ে। তখন ওই কক্ষে ক্লাস চলছিল। ওই ঘটনায় এখন পর্যন্ত ২২ জন নিহত হয়েছে। কমপেক্ষ ১৭১ জন আহত হয়েছে। বিমানের পাইলট নিহত হয়েছে। নিহত ও আহতের বেশির বাগই শিশু। স্বাস্থ্য খাতে পর্যাপ্ত অবকাঠামো না থাকায় আহতদের চিকিৎসা কার্যক্রম বাধাগ্রস্থ হচ্ছে।
স্কুলটি দেড় টায় ছুটি হওয়ার কথা ছিল। ইতিমধ্যে অনেক ক্লাসের ছুটি হয়ে গেছে। শিক্ষার্থীদের অনেকে স্কুলে খেলছিল।কেউ ক্লাস করছিল, কেউ ছুটি শেষে বাসায় ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। বাইরে অপেক্ষা করছিলেন অভিভাবকেরা। তখন বেলা সোয়া একটা, হঠাৎ শোনা গেল বিকট শব্দ। মুহূর্তেই আগুন, ধোঁয়া আর চিৎকার। চারদিকে ছুটাছুটি শুরু হয়। কেউ কিছুই বুঝে ওঠতে পারছিলেন না। চারদিক থেকে লেঅকজন জড়ো হতে থাকে। আগুনের কুন্ডিলির কারনে আশেপাশে কেউ যেতে পারছিল না। কিন্তু ভিতর থেকে ভেসে আসছিল চিৎকার। বাঁচাও বাঁচাও ধ্বনি। অভিবাবকরাও সন্তানদের জন্য কান্নাকাটি শুরু করেন। মা–বাবা ও স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে চারপাশের বাতাস। বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার পরপরই আগুন ধরে যায় স্কুল ভবনে। মাছঠও আগুণের ফুলকি এসে কয়েকজন শিক্ষার্থীকে দগ্ধ করে।
বিমানবাহিনীর এফটি-৭ বিজিআই যুদ্ধবিমান স্কুলটির একটি দোতলা ভবনে বিধ্বস্ত হয়েছে। প্রশিক্ষণের কাজে ব্যবহৃত চীনের তৈরি এই যুদ্ধবিমান যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বিধ্বস্ত হয়েছে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানিয়েছে। তারা জানায়, বেলা ১টা ৬ মিনিটে রাজধানীর কুর্মিটোলার বিমানবাহিনী ঘাঁটি এ কে খন্দকার থেকে উড্ডয়নের কিছুক্ষণ পর বিমানটি স্কুল ভবনের ওপর এসে বিধ্বস্ত হয়।
বিমানটি বিধ্বস্ত হওয়ার পরপরই শুরু হয় উদ্ধার কাজ। ছুটে আসে ফায়ার সার্ভিস, সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশ, বিজিবি, র্যাব, আনসার, স্কাউটসহ স্বেচ্ছাসেবীরা। উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার আগেই মারা যান অনেকে। হতাহতদের উদ্ধারের পর অ্যাম্বুলেন্সে করে নেওয়া হয় উত্তরার বিভিন্ন হাসপাতালসহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে।
চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, আহতদের বেশির ভাগই দগ্ধ হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক। নিহতদের মধ্যে অনেকের শরীর এমনভাবে ঝলসে গেছে যে তাঁদের চেহারাও চেনা যাচ্ছে না। যাঁদের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত করা যাবে না, তাঁদের মৃতদেহ ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে শনাক্ত করে পরে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে। গত রাত পর্যন্ত ৮ জনের মৃতদেশ অভিবাবকের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
আইএসপিআর বলেছে, এফটি-৭ বিজিআই যুদ্ধবিমানটি নিয়মিত প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে উড্ডয়ন করেছিল। এরপর যান্ত্রিক ত্রুটির সম্মুখীন হয়। দুর্ঘটনা মোকাবিলায় এবং বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে বৈমানিক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তৌকির ইসলাম বিমানটিকে ঘনবসতি এলাকা থেকে জনবিরল এলাকায় নিয়ে যাওয়ার সর্বাত্মক চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত বিমানটি ঢাকার দিয়াবাড়িতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের দোতলা একটি ভবনে অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনায় বিধ্বস্ত হয়েছে।
বিমানটি প্রথমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির মাঠে আছড়ে পড়ে। পরে এটি প্রায় ৩০ গজ গর্ত করে সামনে এগিয়ে যায়। পরে দ্বিতল একটি ভবনের নিচতলায় গিয়ে আঘাত করে। বিমানের সামনের অংশ নিচতলার একটি শ্রেণিকক্ষে ঢুকে যায়।
বিধ্বস্ত হওয়ার পরপর বিমানটির বিভিন্ন অংশ ভেঙে যায়। ওই সময়ই আগুন ধরে যায়। তখন সিঁড়ি বেয়ে ভবনটির ফটক দিয়ে যাঁরা বের হচ্ছিলেন, তাঁদের বেশির ভাগ হতাহত হন।
নিহত বৈমানিক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তৌকির ইসলাম প্রথমবারের মতো একা প্রশিক্ষণ বিমান চালিয়েছেন।
বিমানবাহিনীর একই ধরনের বিমান এর আগেও বিধ্বস্ত হয়েছে। ২০১৮ সালের নভেম্বরে টাঙ্গাইলের মধুপুরের রসুলপুরে ফায়ারিং রেঞ্জে মহড়ার সময় বিমানবাহিনীর এফ-৭ বিজি প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হয়। এতে উইং কমান্ডার আরিফ আহমেদ দিপু নিহত হন। এরপর ২০২১ সালের নভেম্বরে চট্টগ্রামের জহুরুল হক ঘাঁটি থেকে উড্ডয়নের পর বঙ্গোপসাগরে বিধ্বস্ত হয় এফ-৭ এমবি। এতে ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহমিদ নিহত হন।
গতকালের দুর্ঘটনার কারণ উদ্ঘাটনে বিমানবাহিনীর উচ্চপর্যায়ের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানিয়েছে আইএসপিআর।
স্কুলটির শিক্ষিকা পূর্ণিমা দাশ ফেসবুকে এক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, স্কুল ছুটি হয় বেলা একটায়। এরপর দুই ঘণ্টা কোচিংয়ের জন্য কিছু ছাত্রছাত্রী স্কুলে ছিল। যাদের অভিভাবক তখনো নিতে আসেননি, এমন শিক্ষার্থীরা অপেক্ষা করছিল। এমন সময় বিমানটি বিধ্বস্ত হয়।
ঘটনার সময় ৮০ ভাগ বাচ্চা বাড়ি চলে গেছে। আমি কিছু বোঝার আগে দেখি, ছোট বাচ্চাগুলো দৌড়ে আসছে। দেখলাম, তাদের সারা গায়ে আগুন। আমি কোনোরকমে ওয়াশরুমে গিয়ে পানি ঢালছি দু–তিনজনের গায়ে।’
সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে আইএসপিআর জানায়, হতাহতদের রাজধানীর আটটি হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় ২২ জন নিহত ও ১৭১ জন আহত হয়েছেন।
নিহতদের বেশির ভাগের ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয়েছে।
আইএসপিআরের তথ্য অনুযায়ী, আহতদের মধ্যে বার্ন ইনস্টিটিউটে ৭০ জন, ঢাকা মেডিকেলে ৩ জন, ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) ১৭ জন, উত্তরা আধুনিক হাসপাতালে ৬০ জন, উত্তরার লুবনা জেনারেল হাসপাতাল অ্যান্ড কার্ডিয়াক সেন্টারে ১১ জন, কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে ৮ জন, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে একজন এবং উত্তরা ক্রিসেন্ট হাসপাতালে একজনকে নেওয়া হয়েছে। তবে পরে অনেকে চিকিৎসার প্রয়োজনে হাসপাতাল পরিবর্তন করেছেন বলে জানা গেছে।
মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমান বিধ্বস্ত হয়ে আহতদের বিনা মূল্যে চিকিৎসা দেবে সরকার। স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা নুরজাহান বেগম জানিয়েছেন, সরকারি হাসপাতাল ছাড়াও সব বেসরকারি হাসপাতালকে সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এদিকে আহহতদের উদ্ধারে মেট্রোরেলের একটি বগি রিজার্ভ রাখ হয়। যাতে দ্রুত আহতদের হাসপাতালে আনা যায় সেজন্য এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
