নিজস্ব প্রতিবেদক
‘এনেছিলে সাথে করে মৃত্যুহীন প্রাণ, মরণে তাই তুমি করে গেলে দান’ কবিতার এই লাইন দুটি বিশ্ব কপি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশকে উদ্দেশ্য করে লিখেছিলেন। এর মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে, চিত্তরঞ্জন দাশ দেশ ও মানুষের জন্য কাজ করার যে অসীম প্রাণশক্তি নিয়ে এসেছিলেন, মৃত্যুর মাধ্যমে তিনি সেই শক্তিকেই যেন সবার মাঝে দান করে গেলেন।
ঠিক তেমনি একটি ঘটনা ঘটেছে উত্তরায়। উত্তরার মাইস্টোন স্কুলে বিমান বিধ্বস্ত হলে সবাই যখন নিজের প্রাণ বাঁচাতে ছুটোছুটি করছে তখন নিজের জীবন দিয়ে অন্তত ২০ জন শিক্ষার্থীর প্রাণ রক্ষা করেছেন শিক্ষিকা মাহেরীন চৌধুরী। মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে নিজের দায়িত্ব থেকে একচুলও সরে যাননি। এই শিক্ষিকা শিক্ষার্থীদের স্কুল ভবন থেকে বের হতে সহায়তা করেছেন।একপর্যায়ে নিজেই আগুনের জালে আটকে পড়েন। শরীরের অধিকাংশ দগ্ধ হয় তার। তাকে গুরুতর অবস্থায় নেওয়া হয় জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে। ওই দিন রাত ৯টা ৪৫ মিনিটে লাইফ সাপোর্টে থাকা অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মত্যুকালে তিনি স্বামী ও দুই সন্তান ও বহু গুণগ্রা্হী রেখে গেছেন।
এ ঘটনা জেনে মানুষ তার আত্মত্যাগের কথা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছে। এখন দেশের মানুষের চোখে সাহসিকতার প্রতীক তিনি। তার আত্মত্যাগে গর্বিত দেশবাসী। অনেকেই বলেছেন, মাহেরীন সাহসীকতার ও মানবিকতার উদাহরণ হয়ে থাকবেন। তাকে মানুষ স্মরণ করবে। মরণেও তিনি অমর হয়ে রইলেন।
মাহেরীনের বাড়ি নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলার বগুলাগাড়ি গ্রামে। সেখানেই জন্ম নেওয়া মাহেরীন ছিলেন স্থানীয় বগুলাগাড়ি স্কুল অ্যান্ড কলেজের নির্বাহী কমিটির সভাপতি । ঢাকায় চাকরি করেও তিনি গ্রামের স্কুলের কমিটির দায়িত্ব পালন করেছেন। পারিবারিক পরিচয়েও ছিলেন একজন পরিচিত মুখ। তিনি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভাতিজি। তার বাবা মহিতুর রহমান জিয়াউর রহমানের খালাতো ভাই। দাদি রওশানারা চৌধুরী ছিলেন জিয়াউর রহমানের খালা। বাবা মহিতুর রহমান চৌধুরী ও মা সাবেরা চৌধুরী দুজনই সমাজসেবায় সম্পৃক্ত ছিলেন।
মঙ্গলবার বিকেল ৪টায় গ্রামের স্কুল প্রাঙ্গণে জানাজা শেষে বাবা-মায়ের কবরের পাশে তাকে দাফন করা হয়। জানাজায় অংশ নেন হাজারো মানুষ। তার মৃত্যুর গৌবর গাথা এলাকার মানুষের মুখে মুখে। মরে গিয়েও তিনি শুধু এলাকায় নয়, সারাদেশে আলোচনায় ওঠে এসেছেন। পাচ্ছেন মানুষের ভালবাসা। জীবিত অবস্তায় যেই মাহেরীনের নাম স্কুল আর নিজের এলাকার গন্ডি ও পরিচিতজনদের বাইরে কেউ জানতো না, সেই মরণে মাহেরীনের নাম হয়ে গেল বাংলাদেশময়। সামাজিক মাধ্যমে মাহরিনকে নিয়ে ব্যাপক আলোচনা। তার প্রতি জানাচ্ছেন বিনম্র শ্রদ্ধা।
নিজের এলাকায় নামাজে জানাজার পর মাহেরীনের স্বামী মনসুর হেলাল সাংবাদিকদের বলেন, শেষ রাতে হাসপাতালে ওর সঙ্গে আমার শেষ দেখা। ও আমার হাত ধরে নিজের বুকের সঙ্গে চেপে ধরেছিল। বলেছিল, আমার সঙ্গে আর দেখা হবে না।
ভাঙা কণ্ঠে তিনি বলেন, আমি ওকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তুমি তোমার নিজের দুই সন্তান, ওদের কথা একবারও ভাবলে না? সে বলেছিল, ওরাও তো আমার সন্তান। আমি তাদের একা রেখে আসতে পারিনি।
মনসুর হেলাল বলেন, আগুন লাগার পর সবাই যখন দৌড়াচ্ছে, তখন মাহেরীন বাচ্চাদের বের করে আনছিল। কয়েকজনকে বের করে আবার ফিরে গিয়েছিল বাকি বাচ্চাদের আনার জন্য। সেই ফেরাটা আর শেষ হয়নি।
মাহেরীনের চাচা রিকো চৌধুরী বলেন, ছোটবেলা থেকেই মাহেরীন মেধাবী ছিলেন। ঢাকায় থেকেও এলাকার মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন, সহযোগিতা করতেন।
বগুলাগাড়ি এলাকার বাসিন্দা সোনালী ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা মোস্তফা আজাদ তিনি একজন সৎ, ভালো মানুষ ছিলেন। বই-খাতা কিনে দিতেন এলাকার দরিদ্র শিশুদের। আমরা একজন আদর্শ মানুষকে হারালাম।
বগুলাগাড়ি স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মহুবার রহমান বলেন, তিনি শুধু একজন শিক্ষক ছিলেন না, ছিলেন মানবিক বীর। আমরা শিক্ষক সমাজ তার আত্মত্যাগে গর্বিত ও শোকাহত।
