নিজস্ব প্রতিবেদক
২০২৪ সালের ১৪ জুলাই ছিল রোববার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলন। রাজধানীর গণভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বক্তৃতা করেন তিনি। চীন সফর করে দেশে এসে তিনি এই সংবাদ সম্মেলন করেন। এতে চীন সফরের চেয়ে বেশি প্রশ্ন আসে কোটা আন্দোলন নিয়ে। বিশেষ করে টেলিভিশনের কয়েকজন সাংবাদিক কোটা আন্দোলনের বিরুদ্ধে প্রশ্ন করেন প্রধানমন্ত্রীকে। প্রধানমন্ত্রীও সুযোগ নিজের ঝাল ঝেড়ে দেন সংবাদ সম্মেলনে। এক পর্যায়ে তিনি কোটা আন্দোলনকারীদেরকে রাজাকারের নাতি পুতিদের সঙ্গে তুলনায় করেন। মুহূতেই এটি সারাদেশে বিক্ষোভের আগুন জ্বালিয়ে দেয়। সন্ধ্যার পর থেকেই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা প্রতিবাদে মাঠে নেমে আসে। রাত যত গলীর হতে থাকে আন্দোলনও তীব্র হতে থাকে। এক পর্যায়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা হল ছেড়ে ক্যাম্পাসে নেমে আসে। ছাত্রলীগ প্রতিরোধের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। পুরো ক্যাম্পাস চলে যায় বিক্ষোদ্ধ কোটা বিরোধী শিক্ষার্থীদের দখলে। এ সময় তারা শ্লোগান দিতে থাকে, ‘তুমি কে আমি কে রাজাকার রাজাকার, কে বলেছে কে বলেছে, স্বৈরাচার স্বৈরাচার’। চাইতে এলাম অধিকার, হয়ে গেলাম রাজাকার ইত্যাদি শ্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো ক্যাম্পাস। সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলন সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। কোটা বিরোধী আন্দোলন আরও জ্বলে ওঠে।
প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনে কোটা নিয়ে একটি টেলিভিশন চ্যানেলের সংবাদিক প্রশ্ন না করে তার মতামত তুলে ধরে বলেন, আমাদের তরুণ প্রজন্মকে ভুল বুঝিয়ে যুক্তিযুদ্ধের মুখোমুখী করা হয়েছে। এটি খুবই দুর্ভাগ্যজনক। আরেকটা খুবই ভুল ধারা তৈরি করা হয়েছে যে, কোটা এবং মেধা। মনে হতে পারে যারা কোটায় চাকরি করে তাদের কোন মেধা নেই। কিন্তু আবেদন করার ক্ষেত্রে কোটা লাগে না, প্রিলিমিনারিতে কোটা লাগে না। লিখিত পরীক্ষায় কোটা লাগে না। একদম শেষ মুহূতে গিয়ে কোটা এ্যাপ্লাই হয়। তখন আসলে মেধায় সবাই সমান। তখন আমার সামনে যদি দুুইটি অপশন থাকে, দুই জনই সমান মেধাবী। একজন যুক্তিযোদ্দার সন্তান ও আরেকজন রাজাকারের সন্তান। আমি অবশ্যই যুক্তিযুদ্ধের সন্ধানকে চাকরি দেব।
তিনি একথা শেষ না করতেই প্রধানমন্ত্রী জোরের সঙ্গে বলেন, ‘অবশ্যই।’ এরপর পর প্রধানমন্ত্রী থেমে যান। তিনি ওই সংবাদিককে আরও কথা বলার সুযোগ দেন।
ওই সাংবাদিক আরও বলেন, তবে মেধা এবং কোটা দিয়ে খুব সহজে মানুষকে বিভ্রান্ত করা যাচ্ছে। সব মেধাবীদের চাকরিতে না নিয়ে কোটাতে নিচ্ছে। আপনাকে (প্রধানমন্ত্রী) খুবই ধন্যবাদ, যে আপনারা গত ১০/১২ দিন ধরে আন্দোলন হচ্ছে। আপনারা অসীম ধৈর্য্যের সঙ্গে আন্দোলন মোকাবেলা করছেন। যারা আন্দোলন করছেন, তারা সংক্ষুব্ধ, চাকরি না পেয়ে বঞ্ছিত। তাদের ক্ষোভের সাথে আমার খুবই একমত। তাদেরকে পেছনে কেউ ইন্ধন জুগিয়ে, ভুল বুঝিয়ে মুক্তিযুদ্ধেরমুখোমুখী করছে কিনা ? এরপরও তিনি আরও কিছু কথা বলেন। তার কথা শেষ হলে প্রধানমন্ত্রী জবাবে কোটা নিয়ে কিছু কথা বলেন। এক পর্যায়ে তিনি বলে ওঠেন, ‘যুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি এতো ক্ষোভ কেন? তার মানে মুক্তিযুদ্ধের নাতি পুতিরা মেধাবী না। যত রাজাকারের রাচ্চারা, নাতি পুতিরা হলো মেধাবী। এটা মনে রাখতে রাখতে হবে যুদ্ধে কিন্তু যুক্তিযোদ্ধারাই জয়ী হয়েছিল, রাজাকাররা জয়ী হয়নি।’
প্রধানমন্ত্রীর এই মন্তব্য করেন সংবাদ সম্মেলনের বিকেলে। তারপর থেকেই এটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে ওঠে সাংবাদিকের প্রশ্ন ও প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্য। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীসহ সচেতন মহল প্রধানমন্ত্রীর ওই মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা করতে থাকে। এ নিয়ে নানা ধরনের কার্টুনও প্রকাশ পেতে থাকে। সন্ধ্যার পরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে হলে কোটা বিরোধী আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা একত্রিত হতে থাকে। বিসয়টি আচ করতে পেরে ছাত্রলীগও হলে হলে অবস্থান নিয়ে কোটা বিরোধীদের ধাওয়া করে। এক পর্যায়ে কোটা বিরোধীরা সংঘঠিত হয়ে টিএসসিতে সমবেত হয়। শুরু হয় শ্লোগান, ‘ তুমি কে আমি কে রাজাকার রাজাকার, কে বলেছে কে বলেছে, স্বৈরাচার স্বৈরাচার’। চাইতে এলাম অধিকার, হয়ে গেলাম রাজাকার ইত্যাদি শ্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো ক্যাম্পাস। বিভিন্ন হল ও আশে পাশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাও আন্দোলনে যোগ দেয়। ছাত্রীরাও হল গেটের তালা ভেঙ্গে আন্দোলনে যোগ দেয়। সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলন সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। সে দিন থেকে কোটা বিরোধী আন্দোলন আরও জ্বলে ওঠে।
আগুনের ফুলকির মতো ছড়িয়ে পড়ে আন্দোলন
ডেট লাইন ১৪ জুলাই: প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনকারীদের রাজাকার বলা
Previous Article২৪ ঘন্টার মধ্যে দাবি মেনে নিন: শিক্ষার্থীদের আল্টিামেটাম
Next Article কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপে আইএমএফ ‘চুপ’
