নিজস্ব প্রতিবেদক
২০২৪ সালের ৩০ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ কর্মসূচি ঘোষণা করে। ৩১ জুলাই বুধবার দুপুরে সারাদেশে ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ কর্মসূচি পালন করবে তারা। জুলাই আন্দোলনে গুলি করে মানুষ হত্যা, গুম, খুনের প্রতিবাদে এবং হত্যাকারীদের বিচারের দাবিতে তারা এ কর্মসূচী ঘোষনা করে। সারাদেশে আন্দোলন দমনে ১০ হাজার শিক্ষার্থী, রাজনৈতিক নেতা কর্মী ও সাধারণ মানুষকে গ্রেফতার।
অনলাইনে মঙ্গলবার রাতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে এই কর্মসূচির কথা জানানো হয়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আব্দুল কাদের রাত সোয়া ১১টার দিকে এই কর্মসূচি ঘোষণা করেন।
এতে বলা হয়, ‘সারাদেশে ছাত্র-জনতার ওপর গণহত্যা, গণগ্রেপ্তার, হামলা, মামলা, গুম-খুনের প্রতিবাদে ও জাতিসংঘ কর্তৃক তদন্তপূর্বক বিচারের দাবিতে এবং ছাত্রসমাজের ৯ দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে দেশের সব আদালত, ক্যাম্পাস ও রাজপথে আগামীকাল বুধবার দুপুর সাড়ে ১২টায় ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ কর্মসূচি পালন করা হবে।’
ঘোষণায় আরও বলা হয়, ‘আমরা সারা দেশের শিক্ষক, আইনজীবী, মানবাধিকারকর্মী, পেশাজীবী, শ্রমজীবী ও সব নাগরিককে আমাদের কর্মসূচি পালনে সর্বাত্মক সহযোগিতা এবং আমাদের দাবি আদায়ের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করতে বিশেষভাবে অনুরোধ করছি।’
পূর্ব ঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে ৩০ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন মুখে ও চোখে লাল কাপড় বেঁধে ছবি তুলে তা অনলাইনে প্রচারের কর্মসূচি পালন করে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক মাহিন সরকার এই কর্মসূচির ডাক দিয়েছিলেন। তাদের এই কর্মসূচীতে সাধারন মানুষ এতো স্বতস্ফূর্তভাবে অংশ নিয়েছিল যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম একেবারে লাল হয়ে গিয়েছিল।
কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে সংঘর্ষে নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের প্রোফাইল লাল রঙের ফ্রেমে রাঙান অনেকে। এসব ব্যক্তির মধ্যে ছিলেন শিক্ষক, সংস্কৃতিকর্মী, সাংবাদিক, লেখক, শিক্ষার্থীসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। অন্যদিকে সরকার সমর্থকদের অনেকে ফেসবুক প্রোফাইলে কালো রঙের ফ্রেম জুড়ে দেন।

সরকারি চাকরিতে কোটা প্রথা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকে ঘিরে সৃষ্ট সহিংসতায় নিহতদের স্মরণে মঙ্গলবার দেশব্যাপী এক দিনের রাষ্ট্রীয় শোক পালন করা হয়। এদিন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কালো ব্যাজ ধারণ করে কার্যালয়ে উপস্থিত হন। এছাড়া দেশের সব মসজিদে দোয়া-মোনাজাতের আয়োজন করা হয়, মন্দির-গির্জা-প্যাগোডায় বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হয়। দেশের বিভিন্ন স্থানে শোক দিবস উপলক্ষে দোয়া ও মিলাদ মহফিল অনুষ্ঠিত হয়।
এর আগে সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে মঙ্গলবার সারা দেশে শোক পালনের সিদ্ধান্ত হয়। এরপর রাতে শিক্ষার্থীদের ৯ দফা দাবির পক্ষে রাষ্ট্রীয় শোক প্রত্যাখ্যান করে মঙ্গলবার মুখ ও চোখে লাল কাপড় বেঁধে ছবি তোলার কর্মসূচি ঘোষণা করেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কয়েকজন সমন্বয়ক।
এদিকে, দেশে ছাত্র-জনতা হত্যা, নির্যাতন, গণগ্রেপ্তার, হামলা-মামলার প্রতিবাদ জানান সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের মানুষজন। তারা মঙ্গলবার রাজধানীর গুলিস্থানে প্রতিবাদী গানের মিছিল করে এ প্রতিবাদ করেন। এসময় মিছিলে পুলিশ বাধা দিলে প্রতিবাদকারীদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডা ও ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে।
এইদিন পুরানা পল্টন মোড়ে আয়োজিত এক সমাবেশ থেকে বাম গণতান্ত্রিক জোটের নেতারা সরকারের পদত্যাগ চেয়ে বিক্ষোভ করেন।
আগামী ২৪ ঘন্টার মধ্যে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ছয় সমন্বয়কসহ ডিবিতে আটক অন্যান্যদের নিঃশর্ত মুক্তি দেয়া না হলে আরও কঠোর আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়া হবে বলে জানায় বিক্ষুব্ধ নাগরিক সমাজ।
কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে দেশব্যাপী সংঘাত-সহিংসতার ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করতে জাতিসংঘসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার কাছে সহযোগিতা চান তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘আমরা জাতিসংঘের কাছেও আবেদন করেছি। আন্তর্জাতিকভাবেও বিভিন্ন সংস্থা রয়েছে দেশে-বিদেশে, তাদের কাছেও আমরা সহযোগিতা চাই যে এই ঘটনার যথাযথ সুষ্ঠু তদন্ত হোক এবং যারা এতে দোষী, তাদের সাজার ব্যবস্থা হোক। কারণ, আমি জানি এতে আমার কোনো ঘাটতি ছিল না।’
কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে সহিংসতায় মঙ্গলবার পর্যন্ত রাজধানী ঢাকায় ২৬৪টি মামলা হয়। এর মধ্যে হত্যা মামলা ৫৩টি। আরও পাঁচটি মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছিল। সব মিলিয়ে মঙ্গলবার পর্যন্ত ঢাকায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে ২ হাজার ৮৫০ জনকে। সারাদেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তারের সংখ্যা অন্তত ১০ হাজার।
কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে সংঘর্ষে প্রাণহানির ঘটনা নিয়ে পর্যবেক্ষণ ও কিছু দাবি তুলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্দেশে একটি খোলাচিঠি লিখেন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মহাসচিব অ্যাগনেস ক্যালামার্ড। ওই চিঠিতে ক্যালামার্ড বাংলাদেশে কোটা সংস্কার আন্দোলনে সাম্প্রতিক সহিংস দমনাভিযানের বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে শিক্ষার্থীদের ওপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিশ্বাসযোগ্য তথ্যপ্রমাণ পেয়েছেন বলে জানান জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস। এর পরিপ্রেক্ষিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে যেকোনো পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত বলেও জানিয়েছেন তিনি।
বাংলাদেশে কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে ‘দেখামাত্র গুলির নির্দেশ’ দেওয়া ও আইনবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। ইইউর পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান জোসেপ বোরেল মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে এ উদ্বেগের কথা জানান।
বৈষম্যেবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ছয় সমন্বয়ককে গত পাঁচ দিন ধরে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা (ডিবি) হেফাজতে রাখা হয়।
শিক্ষার্থীদের হত্যার প্রতিবাদে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রধান ফটকের সামনে অভিভাবকরা মৌন অবস্থান করতে গেলে তাতে পুলিশ বাধা দেয়। বাংলাদেশ নারী মুক্তি কেন্দ্রের ব্যানারে তারা সেখানে দাঁড়াতে চাইলে তাদের সরিয়ে দেওয়া হয়।
